রিপোর্ট : নিজস্ব প্রতিবেদক :
লক্ষ্মীপুরে নারী আসামিকে জেলে পাঠানোর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা।
লক্ষ্মীপুরে মারামারির এক মামলায় ফারহানা আক্তার শিল্পী নামের এক নারীকে দুধের শিশুসহ কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আদালতের নির্দেশে তাঁকে কারাগারে নেওয়ার সময় তাঁর কোলজুড়ে ছিল আড়াই বছরের শিশু সন্তান। অন্যদিকে স্কুলড্রেস পরা আরও দুই সন্তান জেলগেটে দাঁড়িয়ে মায়ের জন্য অপেক্ষা করছিল। হৃদয়বিদারক এ দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
সোমবারদুপুরে লক্ষ্মীপুরের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতের বিচারক শাহ জামাল সিআর-৫৬৫ নম্বর মামলায় শিল্পী ও সহ-আসামি জহির উদ্দিনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে বিকেলে তাঁদের জেলা কারাগারে নেওয়া হয়।
আদালতসূত্রে জানা যায়, আদালতের নির্দেশের পর আসামিদের প্রথমে পুলিশ হাজতে রাখা হয়। আদালতের পেশকার দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আসামিদের আদালতের হাজতে রাখা হয়েছিল। পরে শিশুটিকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।”
তবেলক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার নুর মোহাম্মদ সোহেল জানান, আড়াই বছরের শিশু সিয়ামকে নিয়ে তাঁর মা ফারহানা আক্তার শিল্পী বর্তমানে কারাগারেই আছেন। বিকেলে তাঁদের কারাগারে আনা হয়েছে।
ঘটনারপরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয় কয়েকটি ছবি ও ভিডিও। সেখানে দেখা যায়, প্রিজনভ্যানে শিশুকে কোলে নিয়ে বসে আছেন শিল্পী। আরেক ছবিতে দেখা যায়, স্কুলড্রেস পরা দুই শিশু জেলগেটের সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের অপেক্ষা করছে। এসব ছবি প্রকাশ করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মহসিন কবির স্বপন।
তিনিজানান, শিল্পীর অন্য দুই সন্তান—পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র শিপন হোসেন (১০) ও দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী তামান্না আক্তার (৮)—মায়ের সঙ্গে দেখা করতে জেলগেটে গিয়েছিল। তারা শহীদ স্মৃতি আদর্শ একাডেমির শিক্ষার্থী এবং বর্তমানে তাদের পরীক্ষা চলছে।
ফেসবুকেদেওয়া এক স্ট্যাটাসে আইনজীবী মহসিন কবির স্বপন লেখেন, “মায়ের সঙ্গে দুগ্ধজাত এক বছরের শিশুটিও হাজতে। আরও দুটি শিশুর পরীক্ষা চলমান।”
তিনিআরও দাবি করেন, ঘটনার ভিডিওতে শিল্পীকেই মারধরের শিকার হতে দেখা যায়। তাঁর ভাষ্য, “ভিডিওতে দেখা যায় গোলাপি জামা পরা মেয়েটি নিজেই মার খাচ্ছেন। অথচ মামলায় তাকেই হামলাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।”
আসামিপক্ষেরআরেক আইনজীবী রাকিবুল হাসান তামিম বলেন, মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে যে শিল্পী লোহার রড দিয়ে বাদীর মাথায় আঘাত করে গুরুতর জখম করেন। তবে পরে আদালতে জমা দেওয়া মেডিকেল সার্টিফিকেটে আঘাতের ধরন ‘সিম্পল’ বা সাধারণ জখম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনিবলেন, “ঘটনাটি জামিনযোগ্য হলেও আদালত শিল্পীসহ দুজনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। এখন তাঁর দুধের শিশুটিও মায়ের সঙ্গে কারাগারে রয়েছে।”
মামলারএজাহার সূত্রে জানা যায়, বাদী মাহতাব উদ্দিন ভূঁইয়া লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাহাপুর এলাকার বাসিন্দা। গত ১৫ এপ্রিল তাঁর ওপর হামলার অভিযোগ এনে তিনি অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী সদর আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রতিবেশী ফারহানা আক্তার শিল্পীসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়।
এজাহারেবলা হয়, শিল্পী লোহার রড দিয়ে বাদীর মাথার পেছনে আঘাত করলে তাঁর মাথার হাড় ভেঙে যায়। তবে চিকিৎসা সনদে আঘাতকে সাধারণ জখম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনাটিঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে ছোট শিশুদের মানসিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সচেতন মহল। একই সঙ্গে মামলার প্রকৃতি, জামিনযোগ্য ধারা এবং আদালতের সিদ্ধান্ত নিয়েও চলছে আলোচনা।