রিপোর্ট : আব্দুল আজিজ:
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে সাধারণত তার নীতি, অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ কর্মপথের একটি প্রাথমিক নির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ১০০ দিনে জনকল্যাণ, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এসব উদ্যোগ দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা সময়ই বলে দেবে; তবে প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
সরকারের সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি। নিম্নআয়ের পরিবার ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এই ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে নারীকেন্দ্রিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার যে প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য বিমোচনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত এবং অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক ভাতা চালুর উদ্যোগ সামাজিক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতিশীলতায় সহায়ক হতে পারে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ড্রেস ও মিল বিতরণ কর্মসূচি শিক্ষা ক্ষেত্রে ঝরে পড়া রোধ এবং দরিদ্র পরিবারের আর্থিক চাপ কমানোর একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতে হামের টিকাদান কর্মসূচির শতভাগ সফলতা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের সক্রিয় ভূমিকা প্রশংসার দাবিদার। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও ভর্তুকির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সীমিত রাখতে সহায়তা করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কৃষি খাতে ৬৬৬টি খাল খনন ও সংস্কার কার্যক্রম দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের প্রেক্ষাপটে পানি সংরক্ষণ ও সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। এ ছাড়া বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা প্রকল্প ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের ধারাবাহিকতায় প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করার উদ্যোগ শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক জ্ঞানভান্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত করতে সহায়ক হবে।
তবে সরকারের এই প্রথম ১০০ দিনের অর্জনের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও সামনে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এখন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। জনগণ দৃশ্যমান উন্নয়নের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য কমা, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাসের প্রত্যাশা করে।
প্রথম ১০০ দিন কোনো সরকারের চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় নয়; বরং এটি ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার ভিত্তি নির্মাণের একটি পর্যায়। জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি, কৃষি উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনার যে ভিত্তি সরকার স্থাপন করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তা বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। এখন প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। কারণ সরকারের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে ঘোষণায় নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনমানের বাস্তব উন্নয়নে।