রিপোর্ট : নিজস্ব প্রতিবেদক :
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একটি স্বাধীন, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম শুধু সংবাদ পরিবেশনই করে না, বরং সমাজের বিবেক হিসেবে কাজ করে। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বৈঠকে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের কাছ থেকে কোনো দলীয় আনুগত্য বা লেজুড়বৃত্তি প্রত্যাশা করে না; বরং চায় সত্যনিষ্ঠ, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন প্রত্যাশা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কারণ অতীতে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমকে রাজনৈতিক বিভাজনের শিকার হতে হয়েছে। কখনো রাষ্ট্রীয় চাপ, কখনো রাজনৈতিক প্রভাব, আবার কখনো অর্থনৈতিক সংকট সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
গণমাধ্যমের প্রধান দায়িত্ব সত্যকে তুলে ধরা। তবে সত্য প্রকাশের পাশাপাশি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করাও তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। প্রধানমন্ত্রী যে মানুষের বিবেক, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন, তা সময়োপযোগী। বর্তমান বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার, অপতথ্যের প্রসার এবং চটকদার সংবাদ পরিবেশনের প্রতিযোগিতার মধ্যে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
তবে স্বাধীন সাংবাদিকতার পূর্বশর্ত হলো গণমাধ্যমের জন্য একটি নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা। বৈঠকে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর কর্মকর্তারা যে নীতিগত ও আর্থিক সংকটের বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন, সেগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান জরুরি। কারণ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল গণমাধ্যম কখনোই পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, সংবাদমাধ্যমের আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং তথ্যপ্রাপ্তির অবাধ সুযোগ নিশ্চিত না হলে স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন হবে।
একই সঙ্গে গণমাধ্যমকেও আত্মসমালোচনার সুযোগ নিতে হবে। রাজনৈতিক পক্ষপাত, অতিরঞ্জিত উপস্থাপন, গুজবনির্ভর সংবাদ কিংবা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের চরিত্রহননের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। গণমাধ্যম যদি জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে, তবে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ই উপকৃত হবে।
নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে অঙ্গীকার বর্তমান সরকার করেছে, সেই যাত্রায় গণমাধ্যম অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তবে অংশীদারত্বের অর্থ আনুগত্য নয়; বরং সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া, ভুল-ত্রুটি তুলে ধরা এবং জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করা। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে সরকার ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, জবাবদিহিতা ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে।
গণমাধ্যম যদি স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে এবং সরকার যদি সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আন্তরিক থাকে, তাহলে একটি জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথ আরও সুগম হবে।