বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
নিষিদ্ধই থাকছে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম, সংসদে বিল পাস: সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা: ঢাকা মেডিকেলে নিয়োগ বাণিজ্যেরসহ দুর্নীতির মহাকেলেঙ্কারি: অর্থের বিনিময়ে বিক্রি চাকরি, সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হাসপাতাল : সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী আটক: বনানীতে মন্দির উন্নয়নে কোটি টাকার অনুদান, পরিদর্শনে বিএনপি নেতৃবৃন্দ: আর আর কেবলের সর্বোচ্চ বিক্রেতা মিথিলা এন্টারপ্রাইজ, সারা দেশে তৃতীয় স্থান অর্জন: এলপি গ্যাসের দাম একলাফে ৩৮৭ টাকা বৃদ্ধি: চাপে সাধারণ মানুষ, উদ্বেগে অর্থনীতি: শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়নি – মির্জা ফখরুল: সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হতে পারে আজ: এপ্রিল মাসের মধ্যেই ঝিনাইদহ ও ফেনীতে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী:

ঢাকা মেডিকেলে নিয়োগ বাণিজ্যেরসহ দুর্নীতির মহাকেলেঙ্কারি: অর্থের বিনিময়ে বিক্রি চাকরি, সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হাসপাতাল :

রিপোর্ট : নিজস্ব প্রতিবেদক :

দেশের অন্যতম বৃহৎসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠানলগ্নে যেরকম সুনাম অর্জন করেছেন আবার তেমনি দুর্নীতি আর অপকর্মের কর্মকাণ্ড ছেয়ে গেছে । বর্তমানে হাসপাতালে কর্মরত পরিচালক, উপ পরিচালক, সহকারী পরিচালক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি – অপকর্মের সাথে জড়িয়ে থাকার একাধিক অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি ও অপকর্মের সাথে থাকার কারণে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে আগত রোগীরা সঠিকভাবে সেবা পাচ্ছেন না বলে রোগী ও রোগীর স্বজনরা একাধিক ভাবে অভিযোগ করেছেন। ডাক্তার ও নার্স সঠিকভাবে রোগীদের সেবা দিচ্ছেন না এমনকি রোগী ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে প্রায় দুর্ব্যবহার করে থাকে বলে তাদের অভিযোগ। হাসপাতালে কর্তৃপক্ষ বলেন হাসপাতালে পর্যাপ্ত রোগীদের জন্য ওষুধ আছে। কিন্তু রোগীর স্বজনরা এবং রোগীরা জানায়, পর্যাপ্ত ওষুধ থাকলে কেন আমরা পাইনা। ডাক্তার ও নার্সরা সাদা কাগজের সিলিপ ধরিয়েদে বাইরে থেকে ওষুধ কেনার জন্য । রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ এত বড় হাসপাতালের সুনামটি বিলীন করে দিচ্ছে কিছু সংখ্যক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, ডাক্তার , নার্স ও কর্মচারীরা। সব বিভাগেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। কে কাকে দেখবে সবাই তো এক নায়ের মাঝি সেই জন্য দুর্নীতি আর অপকর্মের বিষয়টি দিনে দিনে বেড়েই চলছে। ওই সিন্ডিকেটে কারণে হাসপাতালে বড় ধরনের একটি অর্থ সরকার বঞ্চিত হচ্ছে। সেইসব অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে সিন্ডিকেটের সদস্যরা । ঢামেক হাসপাতালের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের অভ্যন্তরে সাধারণ একাধিক কর্মকর্তা–কর্মচারী ও চিকিৎসকের দাবি, সাম্প্রতিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে সরকারি চাকরি বিক্রি করা হয়েছে। এ নিয়ে হাসপাতালের ভেতরে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শর্তে একাধিক চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করেছে। এই সিন্ডিকেটের সাথে প্রশাসনের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর উঠেছে প্রশাসনিক উপ পরিচালক ডা. আশরাফুল আলম, ভারপ্রাপ্ত প্রধান সহকারী জাহাঙ্গীর আলম , প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) মোহাম্মদ রেজাউল ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও ) মোহাম্মদ সাইফুলসহ আরও কয়েকজনের দিকে।
লিখিত–মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগের
অভিযোগ উঠেছে । অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীরা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নিয়োগপত্র পেয়েছেন। এমনকি একটি কার্পেন্টার পদে কোনো শূন্যপদ না থাকা সত্ত্বেও অর্থের বিনিময়ে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে । যা সরকারি নিয়োগবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, “ঢাকা মেডিকেলের ইতিহাসে নিয়োগ নিয়ে এমন ব্যাপক অনিয়ম আগে কখনো দেখা যায়নি।”
ওয়ার্ড মাস্টার নিয়োগে বড় প্রশ্ন
সম্প্রতি ওয়ার্ড মাস্টার পদে মো. রাইসুল ইসলাম নামের এক প্রার্থীর চূড়ান্ত নির্বাচনের পর নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। তিনি ঢামেক হাসপাতালের সাংগঠনিক সংসদ (চতুর্থ শ্রেণী সরকারি কর্মচারী সমিতি) সাবেক সভাপতি আবু সাঈদ মিয়ার ছেলে।
সূত্রের দাবি, রাইসুল ইসলাম আগে ডেইলি বেসিসে কর্মরত ছিলেন । কিন্তূ তিনি নিয়মিত ডিউটি করতেন না। হাসপাতালের নিচতলায় স্ন্যাকস কর্নারের ইজারা নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অনিয়ম ও অসদাচরণের কারণে তাকে চাকরি থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান কয়েকজন কর্মকর্তা।
তবে সম্প্রতি Directorate General of Health Services এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, তিনি ওয়ার্ড মাস্টার পদে নির্বাচিত চারজনের একজন। এতে হাসপাতালের ভেতরে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে—একাডেমিকভাবে খুব শক্তিশালী না হওয়া সত্ত্বেও তিনি কীভাবে এত কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন?
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শর্তে
কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, প্রশ্নপত্র টাইপ ও প্রস্তুতের দায়িত্বে থাকা প্রধান সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। তাদের দাবি, নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব (উপ পরিচালক) ডা. আশরাফুল আলম আশরাফের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি কর্মচারী চক্র প্রশ্নপত্র বাইরে সরবরাহ করে।
বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, কর্মচারী সমিতির সাবেক সভাপতি আবু সাঈদ মিয়া ভারপ্রাপ্ত প্রধান সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের মাধ্যমে প্রায় ৩৫ লাখ টাকার চুক্তিতে এই নিয়োগ নিশ্চিত করেন। কাজ শেষ হওয়ার পর তাকে অতিরিক্ত আরো ২ লাখ টাকা ‘বকশিশ’ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। আবু সাঈদ মিয়া তার চাকরি জীবন শুরু থেকে এবং কর্মচারীদের নেতা হওয়ার পর থেকে ঢাকা মেডিকেলে তিন ভাইকে চাকরি দেন। এমনকি অবসর আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে জনবলকে নিয়োগ এর ব্যবস্থা করতেন। এছাড়াও হাসপাতালে কর্মচারীদের বাসস্থানের ব্যাপারেও কোয়াটার পাইয়ে দেওয়ার জন্য তার মাধ্যমে মোটা অংকের অর্থ বিনিময়ে তদবির করে কর্মচারীরা কোয়ার্টার পেতেন । তিনি চাকরির শুরু থেকে অবসর এর আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ও অপকর্মের মাধ্যমে হাসপাতাল থেকে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সেই সুবাদে ছেলের চাকরি নিতে মোটা অংকের অর্থ দিতে কোন প্রকার সমস্যা হচ্ছে না । আবু সাঈদ মিয়া যেরকম দুর্নীতি করে নিজেকে অর্থশালী গড়ে তুলেছেন তেমনি তিন ভাইকেও অবৈধভাবে অর্থ কামানোর জন্য হাসপাতালেই চাকরি দিয়েছেন। এরপর নিজের ছেলেকে মোটা অংকের অর্থ দিয়ে চাকরি নিয়েছেন যেন সেও বাবার মত অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করতে পারে । রাইসুলের নিয়োগটি অবৈধ ভাবে হয়েছে বলে একাধিক অভিযোগ রয়েছে । সেই সূত্রে তা নিয়োগের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য সচিব , স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ও উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সুষ্ঠ তদন্ত করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। আবু সাঈদ মিয়া ও তার ভাইদের হাসপাতালে চাকরি কালীন অবৈধ উপার্জনের উৎস ছিল একমাত্র উদ্দেশ্য ।
পদোন্নতিতেও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য
শুধু নিয়োগ নয়, হাসপাতালের ভেতরে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। কর্মকর্তাদের একটি অংশ বলছেন, নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে।
ওষুধ চুরি ও রোগীর খাবারে দুর্নীতির অভিযোগ
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, হাসপাতালে ওষুধ সরবরাহ ও বিতরণেও বড় ধরনের অনিয়ম রয়েছে। অনেক রোগী সরকারি বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও যথাযথ ওষুধ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া রোগীদের খাবার সরবরাহ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকার যে বাজেট দেয় তার তুলনামূলক অনেক কম মানের ও পরিমাণে কম খাবার সরবরাহ করা হয়। হাসপাতালের কিচেন থেকে প্রতি মাসে প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তাকে লাখ লাখ টাকা দিতে হয় বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। কিচেনের সুপারভাইজার হিসেবে সাবেক সভাপতি আবু সাঈদ মিয়া ঠিকাদারদের কাছ থেকে এবং বিভিন্নভাবে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সেখানে তার ভাইকে রেখে দুর্নীতি ও অপকর্ম চালিয়ে গেছেন । হাসপাতালের সুনামটি ধরে রাখতে পারছে না দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের কারণে । রাইসুলের নিয়োগসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ও অপকর্মের হোতাদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এমনকি সাধারণ জনগণও ।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এবং সচেতন মহল বলছেন, দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালকে ঘিরে এমন দুর্নীতির অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা দ্রুত উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে পুরো সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা