রিপোর্ট : নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগক উঠেছে। দুর্নীতির ও অনিয়মকে কেন্দ্র করে হাসপাতালের উপ-পরিচালক (চঃদাঃ) প্রশাসন ডাক্তার আশরাফুল আলম, কর্মকর্তা অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডক্লার্ক মো.
জাহাঙ্গীর আলম , হিসাব রক্ষক (অতিরিক্ত) মো. জালাল আহমেদ ও ক্যাশিয়ার মো. আলমগীর হোসেনসহ আরো অনেক কর্মকর্তা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রক্রিয়ায় তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এবং বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দুর্নীতিবাজ ডাক্তার আশরাফুল আলমের নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের সমিতির নেতারা পুরো হাসপাতালটিকে জিম্মি করে রেখেছে।
হাসপাতালে যে কোন কাজ করতে হলে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই করতে হয়। জানা গেছে, ডাক্তার আশরাফুল আলম ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এককভাবে হাসপাতালটিকে পরিচালনা করে আসছিলেন। বর্তমানে বিএনপি’র মন্ত্রী এমপিদের নাম ভাঙ্গিয়ে একই কায়দায় দুর্নীতি ও অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ময়মনসিংহ জেলার গফুরগাঁও নানার বাড়ি এলাকায় বিলাসবহুল বাড়ি ও নামে বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়েছে । এছাড়াও রাজধানীতে বিলাসবহুল তিনটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন। তিনি আরো নামে বেনামে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে বিভিন্ন ব্যাংকে রেখেছেন । তিনি হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির নামে ট্রেডিং করে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ। তারই সিন্ডিকেটের আরেক সদস্য মো.জাহাঙ্গীর আলম কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার বরশিকুরা গ্রামের জহুর উদ্দিন ভূঞা ও আয়েশা আক্তারের ছেলে তিনি। তার এনআইডি কার্ড নাম্বার ১৯০৬৯৫২২৩৭। তিনিও উপ-পরিচালকের সাথে তাল মিলিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের সাথে জড়িত রয়েছেন। দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে নিজ এলাকায় বিলাসবহুল বাড়ি করেন। এছাড়াও নামে বেনামে অঢেল সম্পদ গড়েছেন। স্ত্রী এবং ভাইবোনদের মাধ্যমে ওই এলাকায় বিভিন্ন জায়গায় জমি কিনেছেন। এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মচারীদের ও সরকারি অর্থ একের পর এক আত্মসাৎ করে যাচ্ছেন বলে একাধিক অভিযোগে জানা গেছে। জাহাঙ্গীর আলম ঢাকায় লক্ষীবাজার রসের গলি এলাকায় একটি বিল্ডিং এর দুইটি ফ্ল্যাট ক্রয় করছেন। ফ্ল্যাট
দুটি নাম্বার হল থ্রি -এ ও বি, বর্তমানে তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন । একই সূত্রে গাথা অতিরিক্ত হিসাবরক্ষক মো. জালাল আহমেদ শান্তিনগর এলাকায় একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন। যার মূল্য প্রায় কোটি টাকা। তিনি বলেন, ওই ফ্ল্যাটটি তার স্ত্রী নামে। সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রশ্ন তার স্ত্রী গৃহিণী এত টাকা পাইলো কোথায়। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ও অপকর্মের একাধিক ও অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন পত্রিকায় ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে একাধিকবার দুর্নীতি ও অপকর্মের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সেইসব দুর্নীতি অনিয়মের কর্মকাণ্ড ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সিন্ডিকেটের মূলহোতা ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের দোসর উপ- পরিচালক ডাক্তার আশরাফুল আলমের মাধ্যমে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে বহাল তবিয়তে থাকেন। এছাড়াও জালাল আহমেদ তার নিজ এলাকায় নামে বেনামে অবৈধভাবে অঢেল সম্পদ গড়েছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। কর্মচারীদের অভিযোগে আরো জানা যায়, জালাল আহমেদ হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কোন তোয়াক্কা করেন না । নিজেই যেন একাই একশ। কারণ হলো সিন্ডিকেটের মূল হোতার ছত্রছায়ায় রয়েছেন বলে। এদিকে একই হাসপাতালের ক্যাশিয়ার আলমগীর হোসেন ওই সিন্ডিকেটের সদস্য হওয়ার কারণে তিনিও কোনক্রমে পিছিয়ে নেই ! মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে চাকরি নিয়ে হাসপাতালে কর্মরত আছেন। চাকরির সুবাদে একের পর এক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতি ও নিয়মের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। কয়েক বছরেই তিনি ঢাকা শহরে একটি ফ্ল্যাট কিনেন। এমনকি তার নিজ গ্রাম এলাকায় নামে বেনামে, স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনদের নামে অঢেল সম্পত্তি ক্রয় করেছেন । একই হাসপাতালে তার স্ত্রী সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে চাকরি করছেন। তার স্ত্রী হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম সাথে জড়িত রয়েছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এমনকি হাসপাতালে কর্মকর্তার কর্মচারীরা তার কাছে কোন বিলের টাকা আনতে গেলে কমিশন ছাড়া টাকা পয়সা দেন না। কমিশন যদি তাকে না দেওয়া হয় তাহলে মাসের পর মাস ওই বিলের টাকা জন্য ঘুরতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যাকে বলে আঙ্গুল ফুলের কলা গাছ হয়ে গেছেন আলমগীর হোসেন। সিন্ডিকেট সদস্যদের অপকর্ম দুর্নীতির কর্মকান্ড লেখে শেষ করা যাবে না। কিন্তু হাসপাতালে পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। এ ব্যাপারে পরিচালক জানান, বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ও কর্মচারীদের নেতারা উপ- পরিচালক ডাক্তার আশরাফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে চলে। সবকিছু যেন সেই নিয়ন্ত্রণ করে বেড়াচ্ছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি। আমি শুধু নামে পরিচালক হিসেবে পরিচালনা করে আসছি হাসপাতালটি । তাদের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মন্ত্রী সচিব ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে হাসপাতালে আরো ভয়াবহ চিত্র দেখা যাবে। কর্মচারীরা অভিযোগ করে বলেন, প্রতিবছরে দক্ষতা বৃদ্ধির ট্রেডিং এর নামে যে অর্থ বরাদ্দ হয় তার থেকে সেকি অংশও আমরা ঠিকমত পাই না । হাতে গুনে কয়েকটি বিভাগের হয়তো ১৫ /২০ জন করে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। আবার অনেকেই এর মধ্যে খাতা হাজিরা দেন না। সেই হাজিরার স্বাক্ষর সিন্ডিকেটের মূল হোতা আশরাফুল আলম তিনি নিজেই সাক্ষ্য দেন বলে কর্মচারীদের অভিযোগ। এভাবেই ট্রেডিং এর নামে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। এমনকি এখনো নেওয়ার পাঁয়তারা করছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অর্থনৈতিক কোড ৩২৩১৩০১-এর আওতায় নিয়মিত বরাদ্দ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকেও প্রশিক্ষণ খাতে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রথম দুইবার ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ হতো। পরের গুলি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। এছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে থোব বরাদ্দ হিসেবে প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা দেওয়া হতো কর্মচারীদের ট্রেডিং এর ব্যবহার জন্য।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বরাদ্দের অর্থের একটি অংশ প্রকৃত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ব্যয় না হয়ে অনিয়মের মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অংশগ্রহণকারীদের তালিকা প্রণয়ন, উপস্থিতি সংরক্ষণ এবং ভাতা বিতরণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অসঙ্গতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণে অনুপস্থিত ব্যক্তিদের উপস্থিত দেখিয়ে ভাতা উত্তোলনের অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া উপস্থিতি রেজিস্টার, বিল-ভাউচার এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে জালিয়াতির অভিযোগও করা হয়। অভিযোগে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন— উপ-পরিচালক (প্রশাসন) (চলতি দায়িত্ব) ডা. আশরাফুল আলম, অতিরিক্ত হিসাব রক্ষক মো. জালাল আহমেদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাউল, কর্মকর্তা অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডক্লার্ক জাহাঙ্গীর আলম এবং ক্যাশিয়ার আলমগীর হোসেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত উপস্থিতি রেজিস্টার, ভাতা বিতরণের নথি, ই-বিল এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। তারা বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
সূত্রমতে, বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে দুদকের আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা যায়নি।
এদিকে চলতি অর্থবছরে পুনরায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে অভিযোগকারীরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, অভিযোগগুলোর দ্রুত তদন্ত না হলে সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।
সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকল নথিপত্র পর্যালোচনা করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।