শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৫ অপরাহ্ন

ফরিদগঞ্জ ভূমি অফিসের ‘ভুল’ প্রতিবেদনে তোলপাড়, রক্তক্ষয়ের আশঙ্কা, ৩৫ বছরের দখল উচ্ছেদের পাঁয়তারা:

রিপোর্ট :জাকির হোসেন সৈকত, চাঁদপুর প্রতিনিধি:

৩৫ বছর ধরে দোকান, নিয়মিত ভাড়া আদায়—হঠাৎ ভূমি অফিসের প্রতিবেদনে দখলদার বদলে গেল! আদালতে বিচারাধীন বিএস রেকর্ড সংশোধনের মামলা থাকার পরও সেই তথ্য তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ না করার অভিযোগ উঠেছে ফরিদগঞ্জের একটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিনের দখলদার পরিবারকে বাদ দিয়ে প্রতিপক্ষকে দখলে দেখিয়ে আদালতে প্রতিবেদন পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে।

এ ঘটনায় ভূমি অফিসের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তথ্য গোপন, একপেশে তদন্ত এবং প্রভাবিত হয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। আর এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেকোনো সময় দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

ঘটনাটি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৬ নম্বর রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের গৃদকালিন্দিয়া কাঁচা বাজার এলাকার।

স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের বরাতে জানা যায়, ১৯৪০ সালে মফিজ উদ্দিন গংয়ের কাছ থেকে সিএস ২৪ খতিয়ানের ৮৭ নম্বর দাগে ১৬ শতাংশ জমি ক্রয় করেন আইয়ুব আলী খান ও নুরেন্নেছা। পরবর্তীতে বাজারের জন্য ওই দাগের ১০ শতাংশ জমি বিক্রি করা হয়। অবশিষ্ট জমির মধ্যে ২ শতাংশ সরকার ৫(২৭)/৭৩-৭৪ নম্বর হুকুমে দখলে নেয়। আর অবশিষ্ট ৪ শতাংশের মধ্যে ১৯৮৫ সালে ৭২৪৮ নম্বর দলিলে ৩ শতাংশ জমি মসজিদে দান করেন আইয়ুব আলী খান।
অভিযোগ রয়েছে, নুরেন্নেছার নামে বিএস রেকর্ড না করে আইয়ুব আলী খান তার নামে ২১ নম্বর খতিয়ানে বিএস ১৮৬ দাগে ২ শতাংশ জমি রেকর্ড করা হয়। এ রেকর্ড সংশোধনের দাবিতে নুরেন্নেছার ওয়ারিশরা ২০২৪ সালে আদালতে ১৩৪ নম্বর মোকদ্দমা দায়ের করেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মামলাটি এখনও বিচারাধীন।

কিন্তু সেই বিচারাধীন মামলার মধ্যেই বিএস রেকর্ডে থাকা বিরোধপূর্ণ জমি আইয়ুব আলী খানের ছেলে মাহাবুবুর রহমান কৌশলে ইউসুফ মিজির কাছে বিক্রি করে দেন। পরবর্তীতে ওই জমির দখল নেওয়ার চেষ্টা করেন ইউসুফ মিজি।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৫ সালে উচ্ছেদ করা হয়েছে—এমন দাবি তুলে ২০২৬ সালে আদালতে মামলা করেন ইউসুফ মিজি। মামলাটি ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ৮ ধারায় দায়ের করা হয়েছে। মামলা নম্বর ৭৯/২০২৬।
মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব আসে উপজেলা ভূমি অফিসে। তদন্ত করেন ১৬ নং রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। আর এই তদন্ত প্রতিবেদন নিয়েই এখন যত প্রশ্ন।
ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ, আদালতে চলমান বিএস সংশোধনী মামলার বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। একই সঙ্গে নালিশি জমিতে বিবাদী পক্ষের দীর্ঘদিনের দখল থাকার বিষয়টিও প্রতিবেদনে বাদ দেওয়া হয়েছে। বরং প্রতিবেদনে বাদী পক্ষকে ২০১৫ সালে উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং বর্তমানে বাদী পক্ষ দখলে রয়েছে—এমন তথ্য দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে—যে জমি নিয়ে ২০২৪ সাল থেকেই আদালতে মামলা বিচারাধীন, সেই মামলার তথ্য তদন্ত প্রতিবেদনে কেন থাকবে না?
আর যদি সত্যিই বিবাদী পক্ষ ৩০-৪০ বছর ধরে জমিটি ভোগদখল করে থাকে, তাহলে তাদের দখলের বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে কেন উঠে আসেনি?
একদিকে ৩৫ বছর ধরে দোকান পরিচালনা ও ভাড়া আদায়ের দাবি, অন্যদিকে আদালতে বিচারাধীন বিএস সংশোধনী মামলা। তার ওপর তদন্ত প্রতিবেদনে মামলার তথ্য না থাকা এবং সাক্ষীদের স্বাক্ষর নেওয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্ন—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, দীর্ঘদিনের দখল, দোকান পরিচালনা ও ভাড়া আদায়ের বাস্তবতা যদি তদন্তে উঠে থাকে, তাহলে প্রতিবেদনে তার প্রতিফলন কতটা হয়েছে?
আরও প্রশ্ন—আদালতে বিচারাধীন মামলার তথ্য কেন প্রতিবেদনে নেই? সাক্ষীদের স্বাক্ষর নেওয়ার সময় কোনো লিখিত বক্তব্য না থাকলে পরে সেই স্বাক্ষর কীভাবে প্রতিবেদনে ব্যবহার করা হলো?

এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
তাদের আশঙ্কা, ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের দখলদার পরিবারকে উচ্ছেদের চেষ্টা এবং পাল্টাপাল্টি মামলা-পাল্টা মামলার কারণে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে।
স্থানীয়দের দাবি, ভূমি অফিসের বিতর্কিত প্রতিবেদন পুনঃতদন্ত, সংশ্লিষ্ট দলিল-রেকর্ড যাচাই, আদালতে চলমান মামলার তথ্য পর্যালোচনা এবং সাক্ষীদের প্রকৃত বক্তব্য যাচাই করা হোক।
একই সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দিয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কারণ একটি ভূমি প্রতিবেদনের ভুল তথ্য শুধু একটি পরিবারের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধই তৈরি করতে পারে না—উস্কে দিতে পারে দীর্ঘদিনের বিরোধ, সংঘর্ষ এমনকি রক্তক্ষয়ও।
এখন দেখার বিষয়, ফরিদগঞ্জ ভূমি অফিসের এই বিতর্কিত তদন্ত প্রতিবেদনের প্রকৃত সত্য কতটা উন্মোচিত হয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না এমন দাবি স্থানীয়দের।

সাক্ষীদের স্বাক্ষর নিয়েও গুরুতর আরও বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন প্রতিবেদনে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ কয়েকজন।
ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান, মনির হোসেন ও দেলোয়ার হোসেনের দাবি, ভূমি কর্মকর্তা তাদের কাছ থেকে সাক্ষীর ঘরে স্বাক্ষর নিয়েছেন। কিন্তু স্বাক্ষর দেওয়ার সময় সেখানে কোনো লিখিত বক্তব্য ছিল না। পরে ওই স্বাক্ষর ব্যবহার করে প্রতিবেদন তৈরি করে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
এ বিষয়টি তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ৩৫ বছর ধরে দোকান চালাচ্ছেন ভাড়াটিয়া
বিরোধপূর্ণ জমিতে থাকা দোকানের ভাড়াটিয়া খোরশেদ আলম বলেন, আমি প্রায় ৩৫ বছর ধরে এখানে দোকানদারি করছি। দোকানের ভাড়া আপেল খানগং নেন। এত বছর ধরে তাদেরকেই মালিক হিসেবে দেখে আসছি।

পাশের দোকানদার ফিরোজ আলম বলেন, আমি ১৪-১৫ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। আপেল খানদের দোকান ভাড়া দিতে এবং ভাড়া নিতে দেখেছি। দীর্ঘদিন ধরে তারাই এই জায়গা ভোগদখল করে আসছেন।

আরেক দোকানদার সেলিম হোসেন বলেন, আমি প্রায় ১৭-১৮ বছর ধরে এখানে দোকান করছি। দোকানটি আপেল খানদের। এতদিনে এ জমি নিয়ে কোনো মারামারি বা দুর্ঘটনা দেখিনি। এখন ভূমি অফিসের রিপোর্টকে কেন্দ্র করে সমস্যা তৈরি হয়েছে।

বর্তমান দখলদার আপেল খান অভিযোগ করে বলেন, এটি আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আইয়ুব আলী খানের ছেলের কাছ থেকে ভুয়া দলিল করে ইউসুফ মিজি আমাদের জমি দখলের চেষ্টা করছেন। দখল নিতে না পেরে এখন আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন। ভূমি অফিসে টাকা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে ভুল রিপোর্ট করানো হয়েছে বলে আমরা মনে করি। আমি সঠিক তদন্ত চাই। সত্যটা বের হয়ে আসুক।
অভিযোগের বিষয়ে ১৬ নং রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, এই জমি নিয়ে যে মামলা রয়েছে, আমাকে বিবাদী পক্ষ তা বলেনি। তাই মামলার কথা উল্লেখ করতে পারিনি।
তবে প্রতিবেদনে মামলার তথ্য যাচাই করা হয়েছিল কি না এবং সাক্ষীদের বক্তব্য কীভাবে নেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
টাকার বিনিময়ে প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো বক্তব্য না দিয়ে তিনি বলেন, আমি কোনো বক্তব্য দিতে পারব না। আমার স্যার সব বলবেন।
ফরিদগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ আর এম জাহিদ হাসান বলেন, ভূমি সহকারী যে তথ্য দেন, আমরা মূলত সেটিতে স্বাক্ষর করে পাঠিয়ে দিই।
তবে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলা থাকা অবস্থায় তদন্ত প্রতিবেদনে সেই তথ্য উল্লেখ না করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উচ্চ আদালতে মামলা থাকলে অবশ্যই নিম্ন আদালতে সে মামলা চলার কথা নয়।
প্রতিবেদনে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে—এমন প্রশ্নের পর তিনি আর কোনো মন্তব্য করেননি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা